আমার মাথা নত করে দাও হে

লুসিফার লায়লা(এডিলেড, সাউথ অস্ট্রেলিয়া)

তিন তলার বসার ঘরে একইরকম আলোহাওয়া খেলবে। আমাদের অসতর্ক আঙুলে পিয়ানোটা আর্তনাদ করবে। হারমোনিয়ামটা অপেক্ষায় থাকবে, অপেক্ষা করবে সরোদটা তাঁর নব্য ছাত্রের হাতে রচিত হতে। কেবল তিনি থাকবেন না। থাকবে কেবল আমাদের শূন্যতা আর থাকবে তাঁকে নিবেদিত তাঁর অতি প্রিয় গান আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তরে

ফেইস বুকে একটা পোস্ট খুব দেখছি সবাই শেয়ার করছে। ১৯৮৪ সালে ক্যামব্রিজের একজন অধ্যাপকের বেতনের সাথে বাংলাদেশের অধ্যাপকের বেতনের তুলনা এবং আরো কিছু বিষয়ের উল্লেখ সম্বলিত পোস্টটি শেয়ার হচ্ছে, লাইক পাচ্ছে। যারা বিষয়টি জানতেন না তারা নতুন করে জেনে তাঁকে ভীষণ মহৎ মহান মনে করে গর্বিত হচ্ছেন। আর আমি যখন পোস্টটি দেখছি তখন কেবল মনে হচ্ছে অর্থ, বিত্ত, খ্যাতির মত অতি লোভনীয় বিষয়গুলো তার জীবনের তুলনায় কতটা ক্ষুদ্র। যদি বলা হয় ৮৪ সালে তিনি তার জীবনকে দেশের জন্যে নিবেদন করতে ফিরে এসেছেন তাহলে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে বলে মনে করি না। আর তার এই ফিরে আসায় তার ব্যক্তিগত ত্যাগের বিষয়টি যেমন মুখ্য তেমনি তার পারিবারিক ত্যাগটিও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা সে সময়ে তিনি তার দুই কন্যার শিক্ষা জীবনকে রীতিমত ঝুঁকির ভেতর ঠেলে দিলেন, স্বদেশের গবেষণায় নিয়োজিত ছাত্রদের সামনে নতুন দিগন্তের উন্মোচনই তাঁর সামনে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সে সময়ে অনেক চেষ্টা করেও তাঁর দুই মেধাবী কন্যাকে স্যার এদেশের কোন পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে অসমর্থ হলেন কেবল তাদের বাংলায় দখল না থাকার জটিলতায়। বাধ্য হয়েই তাদের আবার ফেরত পাঠান যে কারণে নানা সময়ে তিনি দুঃখ করেছেন। এই এত সব কথা যার সম্পর্কে লিখছি তিনি পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. জামাল নজরুল ইসলাম। তথ্য প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে হয় এটাই যে এখন গুগল সার্চ দিলেই সমস্ত তথ্য মুহূর্তে হাতের মুঠোয় চলে আসে। আর সেই সাফল্যের কারণেই তাঁর কর্মময় জীবন, তাঁর কৃতিত্বের ইতিহাস বোধ করি সবাই কম বেশি জানেন। খুব বেশি দূরের নয় আমাদের ছেলেবেলা। তবু তথ্য প্রযুক্তির এত চমৎকার ব্যবহার ছিল না বলেই হয়তো তাঁর সম্পর্কে জেনেছি অনেক পরে এবং এ জানাটি অদ্ভুত। পৃথিবী বিখ্যাত এই মানুষটি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি দেশ পত্রিকার মাধ্যমে, আমাদের দুর্ভাগ্যই বটে নিজের দেশের এই বিখ্যাত মানুষটি সম্পর্কে জানতে হয়েছে পরের দেশের ম্যাগাজিনে পড়ে। সালটা খুব সম্ভবত ৯৪ বা ৯৫ অথবা কিছু আগে পরেও হতে পারে। দেশ পত্রিকার একটি প্রবন্ধে তাঁর সম্পর্কে খানিকটা আলোচনা ছাপা হয়। আমাদের বাবার সুবাদে সে আলোচনা বাসার সবার অবশ্য পাঠ্য হয়ে ওঠে। সেটাই প্রথম তাঁর সম্পর্কে জানা। তার আরো কিছুদিন পরে ফরাসি রবীন্দ্র গবেষক রাদিচে জামাল স্যার সম্পর্কে লেখেন। রবীন্দ্রনুরাগী জামাল নজরুল ইসলামের সাথে রবীন্দ্র গবেষক রাদিচের সখ্যতা দীর্ঘদিনের। সেই সুবাদে রাদিচে বাংলাদেশেও এসেছিলেন। এই রকম ছোট ছোট আলোচনা পড়েই জেনেছি তাঁকে। আর প্রথম দেখি খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরের গুণীজন সংবর্ধনায়। খুব সম্ভবত খেলাঘরই প্রথম (চট্টগ্রামে) তাঁকে এই সংবর্ধনা দেয়। একই অনুষ্ঠানে সৃজনশীল তরুণ আলোকচিত্রী তাপস বড়ুয়াও সংবর্ধিত হন। সেদিনের অনুষ্ঠানে কাছ থেকে দেখে আবিষ্কার করলাম পুরোদস্তুর বিদেশি বেশভুষায় মোড়ানো এই কৃতিমান মানুষটি ভীষণ সহজ সাধারণ অত্যন্ত লাজুক এবং বিনয়ী। দ্যা টলার দ্যা বেম্বো গ্রোজ দ্যা লোয়ার ইট বেন্ড। বাঁশ যত উঁচু হবে তার মাথা তত নিচের দিকে ঝুঁকে আসবে। ইংরেজি এই প্রবাদ বাক্যের সফল রূপটি হলেন জামাল নজরুল ইসলাম। তারপরে আরো অনেক বার দেখেছি নানা অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হয়েছেন সদা হাস্য মুখে। এক সময়ে এসে দূর থেকে দেখার বিষয়টি শেষ হলো সম্পর্কটি পারিবারিক সখ্যতায় রূপ পেলে। আমাদের ছোট ফুফা মোহাম্মদ নাসেরের জেদ ছিল দেশে বসেই বিশ্বমানের গবেষণা করবেন এবং সাফল্যের সাথেই তিনি সেটা করেছেন, ফুফার সাফল্যের প্রাতিষ্ঠানিক শুরুটি করতে তিনি পিএইচডি করতে চট্টগ্রাম আসেন ড. জামাল নজরুল ইসলামের অধীনে। সেই সূত্রে পারিবারিক যোগাযোগটি আরো গভীর হয়। যদিও এই নিবিড়তম যোগাযোগটি বহুলাংশে সীমাবদ্ধ ছিল বাড়ির বড়দের মধ্যে। আমরা ছোটরা তাঁর সাথে হাসি আর কুশল বিনিময় করে আনন্দে আত্মহারা হয়েছি। এভাবেই সময় গড়িয়েছে। আমরাও মাঝে মাঝে বাড়ির বড়দের সাথে তাঁর নানা আয়োজনে অংশ নিতে শুরু করেছি। এই রকমের অনিয়মিত যোগাযোগে তাঁর বাইরের ছবিটাই কেবল দেখা যেত। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে চেনার জানার সুযোগ হয় আমার বিয়ের পরে। রিজভী কেবল স্যারের ছাত্রই ছিলনা, তিনি সন্তানতুল্য স্নেহ দিয়েছেন ওকে। আর ওর সহযাত্রী হিসেবে সে স্নেহ থেকে আমাকেও বঞ্চিত করেননি। আমাদের নানান সময়ে অসময়ে তিনি পাশে ছিলেন যেমন করে পিতা থাকেন সন্তানের পাশে। তারই সুবাদে ব্যক্তিগত জীবনের অতি সহজ, সরল, উদার বিনয়ী শিশুর মত মানুষটির নানা মুহূর্তকে দেখেছি, আর মনে মনে জেনেছি তাঁর অসাধারণ সমস্ত কৃতিত্বের বাইরেও কি ভীষণ রকমের অসাধারণ মানুষ তিনি। নিজের বিষয়ে এত উদাসীন মানুষটি অন্যের বিষয়ে এত সচেতন কি করে ছিলেন আমি ভেবে পাইনা। অন্যের সুখে অসুখে, আনন্দে বেদনায় এত বেশি বিচলিত হতেন যে নিজেকে নিয়ে ভাববার অবকাশ তার জীবনে ছিলনা। মাসের শুরুতে বেতন নিয়ে স্যার কখনোই বাসায় ফিরতে পারতেন না। সমস্ত টাকা উজাড় করে শূন্য ব্যাগে বাসায় ফিরতেন হাসি মুখে। আগামীকাল তার কি করে চলবে সে ভাবনা নিয়ে বিব্রত হতে আমি তাকে কখনো দেখিনি। সংসার চালানোর যাবতীয় ভাবনা মাথায় নিয়ে চাচী যখন অস্থির হতেন স্যার তখন কোনার সোফায় বসে শিশুর মত হাসতেন। তাঁর বাসায় নিয়মিত নানা রকম মানুষের আনাগোনা। এই সব মানুষ স্যারের কাজ, তাঁর জগৎজোড়া খ্যাতি এসবের বিন্দু বিসর্গ জানতো না। এই বাসায় একজন দানবীর থাকেন সেটা শুনে শুনে হাজরো সমস্যার ঝাঁপি নিয়ে এরা আসতো সাহায্যের আশায়। এদের অনেকেই আবার মেকী, ঠগ, ধান্ধাবাজ। স্যার এদের যাচাই বাছাই না করেই সাহায্য দিতেন। পড়াশোনার নাম করে কত কত অছাত্র যে টাকা নিয়ে যেত আর সাথে সাথে সুযোগ পেলেই নিয়ে যেত তাঁর অতি প্রিয় বইপত্র। আক্ষরিক অর্থেই শিশুর মত মন ছিল তাঁর। অনেক সময় সেই মনের কারণে সত্য মিথ্যের ভেদ বুঝতে পারতেন না। চাচীসহ আমরা এসব বিষয়ে বলতে গেলে ভীষণ মন খারাপ করতেন, বলতেন তোমরা এত সহজে মানুষের উপর আস্থা হারিয়ে ফেল কেন, এইসব আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়তেন। অথচ মানুষের উপর দারুণ আস্থার কি নিদারুণ যন্ত্রণা তাঁকে পোহাতে হয়েছে। তবু এবং তারপরও মানুষের উপর আস্থাহীনতার কথা মনেই স্থান দিতে পারেননি কখনো কোন অবস্থাতে। তাঁর সাথে অন্যায় হচ্ছে জেনেও সেটাকে ভুল মনে করে ক্ষমা করেছেন। এসব নিয়ে আলোচনা ভারি হয়ে উঠলে সেটার মোড় ঘোরাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন গান, কবিতা, কিম্বা সাহিত্য নিয়ে। গান ভালবাসতে হুট করে ফোন দিয়ে বলতেন চলে এসো। তারপর সমস্ত সন্ধ্যা সুরে মেতে থাকতেন। মাঝে মাঝে দু চার লাইন কবিতা কিংবা গান বিষয়ক আলোচনা জুড়ে দিতেন। কোন কোন দিন কেবল পিয়ানোতে বসেই কাটাতেন। ভীষণ প্রিয় সে পিয়ানো বুঝি আর প্রিয় স্পর্শে কম্পিত হবে না। সারা বছর ছোটখাটো আর বছরে একবার একটা বড় আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করতেন। এ সুবাদে সারা পৃথিবীর নানা বিষয়ের কৃতিমানরা আসতেন বাংলাদেশে। এদের কেউ নোবেল প্রাইজ পেয়েছে কেউবা মনোনীত হয়েছেন নোবেলএর জন্যে। এক একবার এই রকমের বড় আয়োজন করতেন আর অর্থদন্ডী দিতেন। বাইরে থেকে সাহায্য পেতেন খুবই কম, প্রায় সময়ই নিজের ব্যবস্থা করতে হত। সহকর্মী আর ছাত্রদের সাথে নিয়ে দারুণ উদ্যমের সাথে যখন কাজ শেষ করতেন তখন এত বড় ব্যয়ের বোঝা বহন করতেন প্রায় নিঃশব্দে। দূর থেকে মনে হতে পারে তিনতলা বাড়ি, বইয়ের রয়ালিটি, মাস মাইনের ভারে সম্পদশালী মানুষটির পক্ষে এটা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে অতি সাধারণ এই মানুষটির জীবনে বাহুল্য ব্যয়ের সুযোগ একদমই ছিল না। নিজের আয় তিনি অকাতরে বিলিয়ে কপর্দকশুন্য হয়ে ঘুরতেন হাসিমুখে। চাচী সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন আর স্যার হাসি মুখে দান করছেন। কোন বিলাস দ্রব্যের আড়ম্বর কখনো দেখিনি ও বাসায়। তাঁর একমাত্র বিলাসিতার গাড়িটি তাঁর বড় মেয়ে সাদাফ আপার জোর করে চাপিয়ে দেয়া, পারলে সেটিকেও বাদ দিয়ে দিতেন। একটি মাত্র বিলাসিতা তাঁর ছিল সেটি বইপত্রের। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সঙ্গীত, রাজনীতি, অর্থনীতি এমন কোন শাখা নেই যে বিষয়ে তাঁর গভীর ধারণা নেই। আর এই সব বিষয়ের নানান বইপত্রের সংগ্রহের বিলাসিতায় খুব বেশি যে খরচ করতে পারতেন তা নয় তবু এটা তার একমাত্র বিলাসিতা। সুন্দর ছবি আঁকতেন শুধু তা নয় চিত্রকলা বিষয়ে তাঁর পড়াশোনাও অনেক গভীর আর ভালবাসতেন ছবি সংগ্রহ করতে। চিত্রকলার ছাত্রী ছিলাম বলেই হয়ত আমি গেলেই এ প্রসঙ্গে কোন না কোন আলোচনা উপস্থাপন করতেন। পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে কেনা ছবি অথবা শিল্প বিষয়ক বইপত্র জার্নাল নিয়ে এসে বলতেন, দেখ অথবা বলতেন কোন একটা বই এগিয়ে দিয়ে, পড়ে দেখো। রিজভীর পড়াশোনার তদারকি করতেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল কিন্তু শুধু স্নেহের বশে আমার পড়াশোনা নিয়েও দারুণ আগ্রহ দেখাতেন। এতটা স্নেহ পাবার কোন যোগ্যতাই ছিল না তবু তিনি করেছেন। এই জীবনে এটাই বড় প্রাপ্তি। বিয়ের পর আমরা সংসার কেমন গোছালাম তার তদারকি করতে মাঝে মাঝে চারতলা ডিঙিয়ে যখন বাসায় আসতেন আমার মনে হত এতটা স্নেহের ঋণ আমি শোধ দেব কি করে। রিজভীর দেশের বাইরে আসাটা মানতেই পারলেন না শুরুর দিকে। দারুণ মনোকষ্ট নিয়ে একদম চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। পরে সন্তানের জেদের কাছে যেমন পিতা হার মানে তেমনি হার মেনে ওর কাগজ পত্র সই করেছিলেন। শর্ত ছিল একটাই শেষ করেই দ্রুত দেশে ফিরতে হবে। এখানে আসার অল্প কিছুদিনের মাথায় একদিন গভীর রাতে ফোন করেছিলেন মনে হয় অত রাত হয়ে গেছে অনুমান করতে পারেননি। আমি ফোন তুলতেই কেমন আছি প্রশ্নটি কোন রকমে ছুঁড়ে দিল উত্তরের অপেক্ষা না করেই, জানতে চাইলেন। কবে আসবে তোমরা। বলেছিলাম ওর শেষ হলেই ফিরে আসব। আর ওকে বলেছিলেন আমি আড়াই বছরে শেষ করেছি পিএইডি তুমিও পারবে। শেষ করে এক মুহূর্ত দেরি করবে না। ফিরে এসো ফিরে এসো। আমাদের ফেরার অপেক্ষা নিয়েই চলে গেলেন। জেনে গেলেন না তার সন্তানতুল্য ছাত্রের অগ্রগতি, সাফল্য। অথচ বড় মুখ করে অন্যদের বলতেন আমার এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়ে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের ফেরার অপেক্ষা আর আক্ষেপই এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। শেষবার দেখা করে ফেরার সময় সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিলেন। হঠাৎ পিছু ডেকে বলেছিলেন বউমা তুমি ইচ্ছে করলেই ও ফিরে আসবে। আর ওকে বলেছিলেন তোমাকে অবশ্যই ফিরে আসতে হবে। আমরা ফিরে যাব …. আমাদের তাঁর কাছে ফিরতেই হতো। কিন্তু দুঃখ এই যে আমাদের অপেক্ষায় তিনতলার বসার ঘরে উনি আর থাকবেন না। তাঁর না থাকার শূন্যতার ভেতর আমাদের ফিরতে হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে তাঁর কাজ এবং তাঁকে নিয়ে যতটা আলোচনা তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ মূল্যায়িত হননি নিজের দেশে। এই সব তুচ্ছ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল না। তবু যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, চেনেন, জানেন তাদের বোধ করি দুঃখ হয়। কেননা রাষ্ট্র একটি একুশে পদক দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে । অথচ তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে নামমাত্র ভূমিকাও রাখেনি। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা, বিশ্বমানের গবেষণা, উচ্চতর ডিগ্রির মানোন্নয়ন, সেমিনার সিম্পোজিয়াম, এইসব তাঁর স্বপ্নের কাজ। আর এই সব জন্যে একাই সব্যসাচি হয়ে লড়েছেন। নিজের ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর পরিচয়ের সুবাদে প্রাণান্ত কষ্ট করেছেন দেশের বিজ্ঞান গবেষণার জায়গাটিকে সারা বিশ্বের সাথে মিলিয়ে দিতে। কেবল বিজ্ঞানের কথাই বলছি কেন নিজের বিষয়ের বাইরেও নানা বিষয়ের ওপর আয়োজন করেছেন সেমিনার। তেমনি একটি সেমিনারে নোবেল প্রাইজ পাবার আগেই ঘুরে গেছেন অর্মত্য সেন, আশ্চর্য হলেও সত্যি সে সেমিনারে লোক সমাগমের জন্য স্যার ফোনে ফোনে কতই চেষ্টাই না করেছেন। তখন সরকারি বেসরকারি কোন সংস্থ্যাই অর্মত্য সেনকে নিয়ে একটু বিচলিত হয়নি। কিন্তু সেই তাঁকে নিয়ে কি ভীষণ হৈ চৈ তাঁর নোবেল পাবার পর। আমাদের দেশে এখনও কাজের চাইতে পুরস্কার এর মূল্য অনেক বেশি। খুব সম্ভবত এ কারণেই জামাল স্যারকে আমরা সেভাবে মূল্যায়িত করতে পারিনি। আজ তিনি এই সব মূল্যায়নের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। রেখে গেছেন তাঁর দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা। ১৯৭১ সালে নিভৃতচারী এই মানুষটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপক্ষে জনমত তৈরি করতে নানান ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি লিখে ছিলেন। দেশের সম্পদ রক্ষার বিষয়ে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকেও কথা শোনাতে ছাড়েননি। তাঁর চলে যাওয়ায় দেশ কেবল একজন পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীকে হারায়নি, হারায়নি কেবল একজন বরেণ্য মানুষ, দেশ হারিয়েছে সত্যিকার অর্থেই দেশপ্রেমিক নির্ভিক একজন অসাধারণ মানুষকে।

শেষবারও বাসায় গানের আসরে বসেছিলাম স্যার, চাচী, সাদাফ আপা, কামেল ভাই আর রিজভী। গান শুনিয়েছিলেন সেদিন। অনেক কটা, কবিতাও। কখনো বা আমাদের সাথে গলা মিলিয়ে দিচ্ছিলেন। শেষ করে উঠব যখন তখন বললেন ব্যস এই গানটা গেয়ে শেষ করি। আমাদের সাথে নিয়ে গাইলেন তার অতি প্রিয় গান ‘আমার মাথা নত করে দাও হে….। গানটা সবসময় গাইতেন, এই গানের আগে পরে বহুবার অনেক ভাল গায়কীতে শুনেছি তবু আমার মনে হয় তাঁর মত অমন হৃদয় দিয়ে অতটা অর্থবহ করে এ গান আর কেউ গাইতে পারে না। সত্যিকারের পন্ডিত মানুষ ছিলেন কিন্তু সে পান্ডিত্যের ভারে কখনোই কোন দম্ভ প্রকাশ করেননি। বরং এ গভীর পান্ডিত্য তাঁকে শান্ত, সৌম্য, বিনয়ী একটি রূপ দিয়েছে যা আর কারো মধ্যে এমন করে আমি দেখিনি। এ কারণেই বহুবার মনে হয়েছে উনি বুঝি পৃথিবীর মানুষ হয়েও ঠিক এ পৃথিবীর ছিলেন না। মাঝরাতে হুটহাট আর তাঁর ফোন আসবে না। এক্ষুণি এসো এক্ষুণির দাবিদাওয়া অধিকার নিয়ে আর তিনি কখনোই ডাকবেন না। তিন তলার বসার ঘরে একইরকম আলোহাওয়া খেলবে। আমাদের অসতর্ক আঙুলে পিয়ানোটা আর্তনাদ করবে। হারমোনিয়ামটা অপেক্ষায় থাকবে, অপেক্ষা করবে সরোদটা তাঁর নব্য ছাত্রের হাতে রচিত হতে। কেবল তিনি থাকবেন না। থাকবে কেবল আমাদের শূন্যতা আর থাকবে তাঁকে নিবেদিত তাঁর অতি প্রিয় গান আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তরে।